অ্যালকোহলিসম বা মাদকাসক্তি কি?

অ্যালকোহলিসম হল অ্যালকোহলের প্রতি নির্ভরতা। অনেকদিন ধরে নিয়মিত অধিক মাত্রায় অ্যালকোহল পান করলে   আপনার শরীর অ্যালকোহলের উপর নির্ভরশীল বা আসক্ত হয়ে পড়ে। তার পরঅ্যালকোহল আপনার জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে ওঠে। একজন মদ্যপ বিভিন্ন নেতিবাচক ফলাফল (যেমন চাকরি চলে যাওয়া) সত্তেও অ্যালকোহল পান থেকে বিরত হয় না। অ্যালকোহলিক ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে অ্যালকোহল পানের কারণে তার নিজের এবং অন্যের ক্ষতি হচ্ছে একথা বোঝার পরেও অ্যালকোহল পান থেকে নিজেকে দূরে সরাতে পারে না। কখনও কখনওখুব বেশী মদ পানের ফলে আপনি সমস্যায় পরতে পারেন, কিন্তু এক্ষেত্রে আপনি শারীরিকভাবে মদের উপর নির্ভরশীল নন। এই ঘটনাকে অ্যালকোহল অ্যাবিউস বলা হয়।

অ্যালকোহলিসম কেন হয়?

অ্যালকোহলিসমের প্রকৃত কারণ এখনও জানা যায়নি। তবে আপনি যখন নিয়মিত ভাবে প্রচুর মদ পান  করেন তখন আপনার মস্তিষ্কের রাসায়নিক পরিবর্তন ঘটে এবং অ্যালকোহলের উপর নির্ভরতা তৈরি হয়। এই পরিবর্তনের ফলে মদ্যপান করলে আপনার মনে একটি আনন্দদায়ক অনুভূতির সৃষ্টি হয় যার ফলে এটি ক্ষতির কারণ হচ্ছে জানার পরেও অ্যালকোহল পানের ইচ্ছা আরও বেড়ে যায়। মাদকাসক্তি বা অ্যালকোহলিসম সাধারণত সময়ের  সাথে সাথে ধীরে ধীরে বিকশিত হয়।

মাদকাসক্তি জনিত ঝুঁকিগুলি কি কি?

মাদকাসক্তির সঠিক কারণ অজানা হলেও নিম্নলিখিত কারণগুলির জন্য আপনার মাদকাসক্তি হওয়ার আশংকা অনেক বেড়ে যায়।

  • পুরুষদের ক্ষেত্রে সপ্তাহে ১৫ বা তার বেশী পানীয় গ্রহণ করার প্রবণতা থাকলে
  • মহিলাদের ক্ষেত্রে সপ্তাহে ১২ বা তার বেশী পানীয় গ্রহণ করার প্রবণতা থাকলে
  • প্রতি সপ্তাহে অন্তত একবার পাঁচ বা তার অধিক পানীয় গ্রহণ করা (ব্রিনজ ড্রিন্কিং)
  • পিতা বা মাতা মাদকাসক্ত হলে
  • মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা যেমন বিষণ্ণতা, উদ্বেগ, বা সিজোফ্রেনিয়া ইত্যাদি সমস্যা থাকলে

এছাড়াও আপনার মদ্যাসক্তির ঝুঁকি হতে পারে যদি-

  • কম বয়সে অত্যধিক মানসিক চাপ সহ্য করতে হলে
  • হীনমন্যতায় ভোগলে
  • উচ্চ পর্যায়ের স্ট্রেস বা চাপের মধ্যে থাকলে
  • নিয়মিত মদ্যপানকে খুবই সাধারণভাবে গ্রহণ করা হয় এমন একটি পরিবার বা সংস্কৃতির মধ্যে বাস করলে

মাদকাসক্তি এর লক্ষণগুলো কি কি?

মদ্যাসক্তি এর লক্ষণগুলো আচরণ ও শারীরিক ফলাফলের উপর ভিত্তি করে করা যেতে পারে। মদ্যপ ব্যক্তি নিম্নলিখিত আচরণগুলি সাধারণত করে থাকে:-

  • একা একা মদ্যপান করা
  • মদ্যপান এর প্রভাব অনুভব করার জন্য আরও মদ্যপান করা (মদের উচ্চ সহনশীলতা থাকা)
  • মদ্যপান নিয়ে কিছু বলা হলে হিংস্র বা উৎসৃঙ্খল আচরণ করা
  • খাওয়া নিয়ে অবহেলা বা খুব কম খাওয়া
  • ব্যক্তিগত স্বাস্থ্যবিধিকে অবহেলা করা
  • মদ্যপান করার জন্য কাজ বা স্কুলে অনুপস্থিত থাকা
  • মদ খাওয়া নিয়ন্ত্রণ করতে না পারা
  • নানা অজুহাতে মদ্যপান করা
  • আইনগত, সামাজিক, অর্থনৈতিক সমস্যা সত্তেও মদ্যপান অব্যাহত রাখা

এছাড়াও মদ্যপানের সঙ্গে যুক্ত মানুষের নিম্নলিখিত শারীরিক উপসর্গ হতে পারে:

  • মদের প্রতি আসক্তি
  • মদ্যপান বন্ধ করা হলে নানাবিধ প্রত্যাহার উপসর্গ সৃষ্টি হওয়া যেমন, কম্পন, বমি-বমি ভাব, এবং বমি ইত্যাদি
  • সকালে মদ্যপানের পরে কম্পনের অনুভূতি
  • রাতে মদ্যপানের পরে সকালে সব ভুলে যাওয়া (ব্ল্যাক আউট)
  • বিভিন্ন অসুস্থতা, যেমন অ্যালকোহলিক কিটোঅ্যাসিডোসিস (প্রচণ্ড ডিহাইড্রেশন) বা লিভার সিরোসিস (লিভারে দাগ) ইত্যাদি

অ্যালকোহল সেবনের অভ্যাস বা অ্যালকোহলিসমের সংজ্ঞা

নিজেকে নিজে পরীক্ষাঃ আমি কি মদ্যপ বা অ্যালকোহলিক?

কখনও কখনও নিরাপদ মদ্যপান, মদ্যপান  অ্যাবিউস ও মদ্যপান  নির্ভরতার মধ্যে বিভেদ করা কঠিন হয়ে যায়। এক্ষেত্রে নিজেকে নিম্নলিখিত প্রশ্নগুলি করা যেতে পারে।

  • দিনে পুরুষদের ক্ষেত্রে ৫ এবং মহিলাদের ক্ষেত্রে ৪ বা তার বেশী ইউনিট পানীয় গ্রহণ করা (এক ইউনিট পানীয় হিসেবে ১২ আউন্স বিয়ার, ৫ আউন্স ওয়াইন, বা ১.৫ আউন্স অন্যান্য মদকে বিবেচনা করা হয়)। আপনি কি উল্লেখিত পরিমানের চেয়ে বেশি বা সমান মদ পান করেন?
  • ঘুম থেকে ওঠা মাত্র কি আপনার মদ্যপান করার দরকার হয়?
  • মদ্যপান সম্পর্কে নিজেকে দোষী মনে করেন?
  • আপনার মদ্যপান সম্পর্কে অন্যদের মন্তব্যে কি আপনি খুব বিরক্ত বোধ করেন?
  • আপনার কি মনে হয় যে আপনার মদ্যপানের পরিমাণ কমিয়ে ফেলা উচিত?

পেশাগতভাবে রোগ নির্ণয়

অ্যালকোহল সেবনের অভ্যাস থাকলে এবং অ্যালকোহলিসম লক্ষণ প্রকাশ পেলে চিকিৎসকেরা আপনার বিভিন্ন শারীরিক পরীক্ষা ও আপনার মদ্যপান সম্পর্কে প্রশ্নের মাধ্যমে তা নির্ণয় করতে পারেন।

আপনার ডাক্তার আপনাকে নিম্নলিখিত প্রশ্নগুলি করতে পারেন:-

  • মদ্যপ অবস্থায় গাড়ি চালান কিনা?
  • মদ্যপানের কারণে আপনার কি চাকরি চলে গেছে বা কাজে যেতে পারেননি এমনটি হয়েছে?
  • নেশা করতে কি আগের থেকে বেশী মদ প্রয়োজন হয়?
  • মদ্যপানের ফলে কি আপনার ব্ল্যাক-আউট হয়ে যাওয়ার অভিজ্ঞতা আছে?
  • চেষ্টা করেও মদ্যপানের অভ্যাস ছাড়তে পারেননি?

এর সাথে সাথে আপনার ডাক্তার আপনার পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে  আপনার মদ্যপান নিয়ে কথা বলতে পারেন। আপনার মদ্যপানের আসক্তির মাত্রা মূল্যায়ন করার জন্য নির্দিষ্ট প্রশ্নাবলীর ব্যবহারও করা যেতে পারে। সাধারণত, অ্যালকোহলিসম নির্ণয়ের জন্য অন্য কোনও ধরনের ডায়গনস্টিক পরীক্ষার প্রয়োজন হয় না। তবে, লিভারের ক্ষতি বোঝার জন্য বিভিন্ন রক্ত পরীক্ষা করা হতে পারে। দীর্ঘদিন মদ্যপান করলে আপনার লিভার বা যকৃতের গুরুতর এবং দীর্ঘস্থায়ী ক্ষতি হতে পারে কারণ লিভারের কাজই হল আপনার রক্ত থেকে অ্যালকোহল আলাদা করা।

কিভাবে অ্যালকোহলিসমের চিকিৎসা করা হয়?

অ্যালকোহলিসমের বা মদ্যাসক্তি চিকিৎসার জন্য বিভিন্ন পদ্ধতির সাহায্য নেওয়া হয় যাতে আপনি মদ্যপান করা থেকে পুরাপুরি বিরত থাকেন। চিকিৎসা পদ্ধতিকে কতগুলি পর্যায়ে ভাগ করা যেতে পারে, যেমনঃ-

  • ডিটক্সিফিকেশন ও প্রত্যাহার পদ্ধতি যাতে অ্যালকোহল আপনার শরীর থেকে বেড়িয়ে যায়
  • পুনর্বাসন প্রক্রিয়া যাতে আপনি অ্যালকোহল সেবন বা মদ্যপান থেকে বিরত থাকার বিভিন্ন পদ্ধতি সম্পর্কে অবহিত হন এবং তা প্রয়োগ করতে পারেন
  • মানসিক সমস্যা মোকাবেলা করার জন্য কাউনসেলিং বা পরামর্শ (মানসিক সমস্যা অনেক ক্ষেত্রে আপনাকে মদ্যপানের দিকে নিয়ে যায়
  • অ্যালকোহলিসমের শিকার এমন ব্যক্তিদের জন্য তৈরি সাহায্যকারী সংস্থার সাহায্য নেওয়া
  • অ্যালকোহলিসমের ফলে সৃষ্ট স্বাস্থ্য সমস্যার চিকিৎসা
  • অ্যালকোহলিসম নিয়ন্ত্রণ করার জন্য প্রয়োজনীয় ওষুধ গ্রহণ করা
কিছু ওষুধ আছে যা অ্যালকোহলিসমের চিকিৎসায় খুব কাজ দেয়। সেগুলি হল:-
  • নালট্রেকসন (রেভিয়া ও ভিভিত্রল) যা শুধুমাত্র অ্যালকোহল ডিটক্সিফিকেশনের পর ব্যবহার করা যায়। এই ধরনের ড্রাগ মস্তিষ্কের নির্দিষ্ট রিসেপ্টর অবরুদ্ধ করে কাজ করে (যে রিসেপ্টর মদ্যপানের ফলে হওয়া নেশা নিয়ন্ত্রণ করে)। ফলে মদ খেলে আর নেশা হয় না (তাই মদ খাওয়ার ইচ্ছা চলে যায়)। এই ওষুধ ও কাউন্সেলিং একসাথে চললে ভাল ফল পাওয়া যায়।
  • অ্যাকাম্প্রোসেট (ক্যাম্প্রাল) জাতীয় ওষুধ এলকোহল নির্ভরতার আগে মস্তিষ্ক এর যে মূল রাসায়নিক অবস্থা ছিল তা পুনরায় স্থাপন করতে সাহায্য করে। এই ওষুধটিও কাউন্সেলিং-এর সাথে সাথে প্রয়োগ করা উচিত।
  • ডাইসালফি্রাম (অ্যান্টাবিউস) এমন একটি ড্রাগ যার ফলে মদ্যপান করা মাত্র বিভিন্ন শারীরিক অস্বস্তির সৃষ্টি হয় (বমি বমি ভাব, বমি, মাথাব্যথা ইত্যাদি)

অ্যালকোহল বা মদের প্রতি আপনার আসক্তি যদি অত্যন্ত গুরুতর হয়, তবে কোন নির্দিষ্ট চিকিৎসাকেন্দ্রে ভর্তি হয়ে চিকিৎসা নেওয়ার প্রয়োজন হতে পারে, যেখানে ২৪ ঘণ্টা আপনার ওপর নজর রাখা হবে যাতে আপনি অ্যালকোহলের আসক্তি থেকে পুরপুরি মুক্তি পেতে পারেন। আপনি যখন যথেষ্ট ভাল হয়ে উঠবেন তখন আপনি বাড়ি যেতে পারবেন তবে, আপনাকে বহির্বিভাগের রোগী হিসেবে চিকিৎসা চালিয়ে যেতে হবে।

মদ্যপ রোগীদের প্রতি সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি

অ্যালকোহলিসম বা মদ্যাসক্তি থেকে মুক্তি পাওয়া খুবই কঠিন কাজ। আপনার উন্নতি আপনার মদ্যপান থেকে বিরত থাকার ক্ষমতার উপর নির্ভর করবে। অনেকেই অ্যালকোহলিসম বা মদ্যাসক্তি থেকে মুক্তি পেতে চিকিৎসার সাহায্য নিয়ে সফল হয়েছেন। তবে সম্পূর্ণরূপে অ্যালকোহলিসম থেকে মুক্তি পেতে আপনার আশেপাশের মানুষদের পূর্ণ সহযোগীটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এছাড়াও আপনার উন্নতি অ্যালকোহলিসমের ফলে সৃষ্ট স্বাস্থ্য জটিলতার উপর নির্ভর করবে। অ্যালকোহলিসম বা মাদকাসক্তিগুরুতরভাবে আপনার যকৃত বা লিভারকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। এছাড়াও অন্যান্য স্বাস্থ্য জটিলতা হতে পারে, যেমন:-

  • গ্যাস্ট্রো-ইনটেস্টাইনাল ট্র্যাক্ট বা খাদ্য নালীতে রক্তক্ষরণ
  • মস্তিষ্ক কোষের ক্ষতি
  • খাদ্য নালীতে ক্যান্সার
  • স্মৃতিভ্রংশ (মেমরি লস বা স্মৃতি হারিয়ে ফেলা)
  • বিষণ্ণতা
  • উচ্চ রক্তচাপ
  • অগ্ন্যাশয় প্রদাহ (প্যানক্রিয়েটাইটিস)
  • নার্ভের ক্ষতি
  • মানসিক পরিবর্তন যেমন ওয়ারনিক-কোর্সাকভ সিন্ড্রোম (একটি ডিজেনারেটিভ মস্তিষ্ক রোগ, যেখানে ক্রমাগত মস্তিষ্ক ক্ষয় হয় এবং দৃষ্টি বৈকল্য, স্মৃতিলোপ, অথবা মানসিক বিভ্রান্তির সৃষ্টি হয়, এমনকি কোমাও হতে পারে

আপনি কিভাবে অ্যালকোহলিসম বা মাদকাসক্তি প্রতিরোধ করতে পারেন?

সীমিত  মদ্যপান করা অ্যালকোহলিসম বা মাদকাসক্তি প্রতিরোধের সহজ উপায়। মহিলাদের দিনে একটি এবং পুরুষদের দিনে দুই ইউনিটের বেশী পানীয় পান করা উচিত নয়। আপনার যদি একবারও মনে হয় যে আপনি অ্যালকোহলিসম বা মদ্যাসক্তির শিকার হয়ে পরেছেন তবে অবিলম্বে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।

Share
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •   
  •   
  •   
  •   
  •   
  •  
  •  
  •  
  •  
  •